একজন মনসুর আলী-উপকার করা যার নেশা


আকিব রাজা:  কারো নেশা ডাকটিকিট জমানো, কারো নেশা পুরনো মুদ্রা সংগ্রহ করা কিন্তু এম.মনসুর আলীর নেশা ফেসবুকের মাধ্যমে অসহায় মানুষের উপকার করা। রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কার কিভাবে উপকার করা যায় এসব ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়েন।কে টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারছে না, কার একটি হুইলচেয়ার দরকার,এলাকার কোন ছাত্রটির টাকার অভাবে লেখা-পড়া বন্ধ হওয়া পথে এসব অসহায় মানুষ খোঁজে বের করে তাদের পাশে দাঁড়ান এম.মনসুর আলী। এক বছর তিন মাসে তার ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে সহায়তা পেয়েছে শতাধিক অসহায়-দরিদ্র মানুষ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলী চিকিৎসার অভাবে মরতে বসেছিল। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। ৫মাস যাবৎ বিছানায় শয্যাশায়ী  ছিলেন। বাঁচার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন তাঁর আপনজনেরা। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করার সামর্থ্য নেই তার পরিবার পরিজনের। খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলীর বাড়িতে ছুটে যান এম মনসুর আলী। মুক্তিযোদ্ধার অসহায়ত্বের বিবরণ লিখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সাহায্যের আবেদন জানান। সরাইল সার্কেলের এএসপি মো.মনিরুজ্জামান ফকির মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলীর চিকিৎসার দায়িত্ব নেন।পাশাপাশি অনেক ফেসবুক সংগঠন ও হৃদয়বান ব্যাক্তিরা তাঁর পাশে দাঁড়ান। প্রথমে মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।পরে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানো হয়। মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলী এখন সুস্থ জীবন যাপন করছেন।
মুড়ি বিক্রি করে পড়াশুনার খরচ চালায় সাগর বিশ্বাস। স্কুল ছুটির পর প্রতিদিন অরুয়াইল জনতা ব্যাংকের গেইটের সামনে বসে মায়ের হাতের ভাজা মুড়ি পলিথিনে ভরে পাঁচ টাকার পুটলা করে বিক্রি করে। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ টাকা লাভ হয়। এই টাকার অর্ধেক তার মাকে দেয় সমিতির কিস্তি চালানোর জন্য আর বাকী টাকা দিয়ে কোন রকমে তার স্কুলের খরচ চালায় সে। নিদারুণ অভাবে সাগরের বাবা সংসার ছেড়ে পালিয়েছে ১৫ বছর আগে। এম. মনসুর আলী সাগরের পাশে দাঁড়ান। সাগর বিশ্বাসের করুণ কাহিনী ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করেন।এগিয়ে আসেন বিত্তবান ও দয়ালু ব্যাক্তিরা।সাগর বিশ্বাস এখন আর মুড়ি বিক্রি করে না।এখন সে নিয়মিত স্কুলে যায় ও পড়াশুনা করে।
একদিন স্থানীয় বাজারের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম এম মনসুর আলী । হঠাৎ চোখে পড়লো ১২/১৩ বছরের একটা ছেলে দুই হাত ও দুই পা ব্যবহার করে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভিক্ষা করছে।এভাবে হাতে পায়ে ভর করে চলতে চলতে হাঁটুতে ঘা হয়ে গেছে ছেলেটির। এই দৃশ্য তার মনে ঝড় তোলে। সিদ্ধান্ত নিলেন ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু করার।এরপর ওই দিনই প্রতিবন্ধী শিশুটির তথ্য যোগাড় করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন এবং হৃদয়বানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। ফেসবুক পোস্টের ১০ মিনিটের মধ্যেই সাড়া আসে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব উম্মে  ইসরাতের কাছে থেকে। তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থেকেও দুইদিনের মধ্যেই প্রতিবন্ধী হোসাইনকে হুইল চেয়ার প্রদান করেন।চেয়ারে বসে হোসাইন স্বর্গের হাসি হাঁসলেন। ফেসবুকের মাধ্যমে  মনসুর আলীর মানবসেবার শুরুর গল্পটা এভাবেই।এছাড়া ফেসবুকের সহায়তায় অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহযোগীতা,বিধবাদের সেলাই মেশিন প্রদান,দরিদ্র ও এতিম ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, প্রতিবন্ধীদের মধ্যে হুইল চেয়ার, বৃদ্ধদের শ্রবণ যন্ত্র, অসহায় মহিলাদের সিজারিয়ান অপারেশন এবং অর্ধশত গরীব রোগীকে নিয়মিত ঔষধ কিনে দিচ্ছেন ব্রাহ্মনবাড়িয়ার জেলার সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের বড়ই ছাড়া গ্রামের ৪২ বছর বয়সী এম মনসুর আলী।

অরুয়াইল ইউনিয়নের দুবাজাইল গ্রামের হোসনে আরা বেগম। গর্ভবতী। সমস্ত শরীরে পানি। প্রেসার ১৮০ থেকে ২০০ তে উঠা-নামা করছে। ডাক্তার বলছেন সিজারিয়ান অপারেশন না করলে যে কোন সময় একলামশিয়ায় মা ও সন্তান মারা যেতে পারে। অতি দরিদ্র স্বামী ফজলু মিয়া ডাক্তারের কথা শুনে কাঁদতে লাগলো। ঘরে খাবারই নাই অপারেশনের টাকা যোগাড় করবে কিভাবে! বিষয়টি জানার পর এম মনসুর আলী তার বাড়িতে গিয়ে সব তথ্য সংগ্রহ করে ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করেন। এগিয়ে আসেন আশুগঞ্জ উপজেলার ইউএনও অফিসের সিএ মো. কামরুল ইসলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হিউম্যান জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে ডা. শিরিন সুলতানার তত্তাবধানে ঐ অসহায় মহিলার অপারেশন করা হয়।

ফেসবুকের মাধ্যমে কাজটা কীভাবে হয় প্রশ্ন করলে এম মনসুর আলী বলেন, "সমাজে প্রচুর ভালো মানুষ আছেন, যারা মানুষকে সহায়তা করতে চায়।আমি যখন অসহায় মানুষদের ছবি ও তথ্যসহ ফেসবুকে সাহায্যের আবেদন করি তখন ঐ ভালো মানুষগুলো সহাস্যে এগিয়ে আসেন। 
এম মনসুর আলী ফ্রীল্যান্স সাংবাদিক। চিকিৎসা সেবার সাথে জড়িত। প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষের উপকার করা তার নেশা। নিজেই অসহায় মানুষের তথ্য সংগ্রহ করে ফেসবুকে সাহায্যের আবেদন করেন।এম.মনসুর আলীর এসব আহ্বানে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অনেকেই সাড়া দিয়ে অর্থ পাঠান তার কাছে। কারণ সেই বিশ্বাস তিনি অর্জন করেছেন তার সততার মাধ্যমে।


অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সাংসারিক ভাবে অনেকটা পিছিয়ে পড়ছেন বলে জানান মনসুর আলী। কিন্তু এতে তার কোন দুঃখ নেই।কারণ ফেসবুকের মাধ্যমে অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের উপকার করতে পেরে তিনি মানসিকভাবে তৃপ্ত।

এ ব্যাপারে সরাইল সার্কেলের এএসপি মো.মনিরুজ্জামান ফকির বলেন , আসলে সাংবাদিক এম মনসুর আলীর সঙ্গে আমার পরিচয় মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে গিয়ে।সে-ই আমাকে অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা স¤পর্কে অবগত করেন। সাংবাদিক এম মনসুর আলী যেভাবে মানবসেবা করে যাচ্ছে ফেসবুকে দিয়ে, একদিন সারাদেশে মানবসেবার উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে সে। আমাদের সবার উচিত এম মনসুর আলীকে সহযোগীতা করা,তার পাশে দাঁড়ানো,তাকে উৎসাহ দেওয়া।

Powered by Blogger.